ড. নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান::
প্রতি বছর বোরো ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এলেই হাওরাঞ্চলে এক ধরনের উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। পাকা ধানের সোনালি রঙে মাঠ ভরে ওঠে। এমন সময় ভারি বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল, পানির স্তর বৃদ্ধি, বাঁধ ভেঙে যাওয়া এবং এক রাতেই মাসের পর মাসের শ্রম হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা জাগে। এটি শুধু মৌসুমি দুর্ভাগ্য নয়; বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বারবার ঘটে যাওয়া বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। হাওরের ধান রক্ষা করতে হলে দুর্যোগের পর জরুরি প্রতিক্রিয়ার মানসিকতা থেকে বের হয়ে দুর্যোগের আগেই জলবায়ু-সহনশীল প্রস্তুতির দিকে এগোতে হবে। হাওর অঞ্চল একটি বিশেষ ধরনের নিচু কৃষি এলাকা। বর্ষাকালে এসব এলাকা পানিতে ভরে যায় এবং বড় জলাভূমির মতো হয়ে ওঠে। আবার শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে জমিগুলো খুব উর্বর কৃষিভূমিতে পরিণত হয়। তখন এখানে মূলত বোরো ধান চাষ করা হয়। তাই হাওরের কৃষি অনেকটাই বোরো ফসলের ওপর নির্ভর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাওরের কৃষকরা এ মৌসুমি বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। তারা খুব সীমিত সময়ের মধ্যে ধান চাষ করেন এবং আগাম বন্যা আসার আগে ফসল ঘরে তোলার চেষ্টা করেন। এ কৃষি ব্যবস্থা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে একই সঙ্গে এটি এমন একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে একটি অসময়ের বন্যাই কৃষকের মাসের পর মাসের শ্রম, বিনিয়োগ ও প্রত্যাশা ধ্বংস করে দিতে পারে। হাওরের ধানের গুরুত্ব কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বোরো ধানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হাওর অববাহিকা থেকে আসে। ফলে জাতীয় চাল সরবরাহ, বাজার স্থিতিশীলতা এবং গ্রামীণ জীবিকার ক্ষেত্রে এ অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাখো কৃষক, কৃষি শ্রমিক, ব্যবসায়ী, মিল মালিক ও পরিবহন শ্রমিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ ফসল উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। একজন হাওর কৃষকের জন্য ফসলহানি শুধু কৃষির ক্ষতি নয়। এর অর্থ হলো ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা, মজুরি হারানো, খাদ্যনিরাপত্তার সংকট এবং আরেকটি অনিশ্চিত বছরের শুরু। আর ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকদের জন্য ব্যর্থ ফসল মানে কাজের দিন কমে যাওয়া এবং পরিবারের আয় হ্রাস পাওয়া। প্রায় পাকা ধান যখন পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন ক্ষতির প্রভাব মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। বর্তমানে হাওরের ধান উৎপাদন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে; জলবায়ুগত ঝুঁকি, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও তথ্যগত ঘাটতি। প্রথমত, জলবায়ুগত ঝুঁকি ক্রমেই তীব্র ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। হাওর ও উজানের অববাহিকায় ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যাই সবচেয়ে তাৎক্ষণিক হুমকি। ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যা, যেখানে এক লাখ হেক্টরের বেশি প্রায় পাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়, এ ঝুঁকির ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর আগাম বৃষ্টি ও উজানি ঢলও আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে হাওরের ফসল এখনো মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে। ধানের প্রজনন পর্যায়ে তাপমাত্রাজনিত চাপ ফলন কমিয়ে দিতে পারে। আবার কাটার সময় বৃষ্টি হলে ধান কাটা বিলম্বিত হয়, দানার গুণগত মান নষ্ট হয় এবং ফসল-পরবর্তী ক্ষতি বেড়ে যায়। এল নিনোর মতো জলবায়ুগত ঘটনাও তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের ধরন, খরার ঝুঁকি এবং মৌসুমি অনিশ্চয়তাকে প্রভাবিত করতে পারে। যে অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা প্রধানত একটি ফসলের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এসব ঝুঁকি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো পুরো উৎপাদন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে। দ্বিতীয়ত, কাঠামোগত দুর্বলতা এক্ষেত্রে এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। আগাম বন্যা ঠেকাতে বাঁধই হাওরের প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু বাঁধ নির্মাণে বিলম্ব, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ, অপর্যাপ্ত নজরদারি এবং নি¤œমানের বাস্তবায়ন প্রায়ই এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। হাওরে একটি বাঁধের সামান্য ভাঙনও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করতে পারে। সমস্যাটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি সুশাসন, জবাবদিহি এবং সময়মতো বাস্তবায়নেরও প্রশ্ন। ঝুঁকির সময় ঘনিয়ে আসার পর নির্মিত বা দুর্বলভাবে মেরামত করা বাঁধ আগাম পানির ধাক্কা থেকে দাঁড়িয়ে থাকা ফসল রক্ষা করতে পারে না। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক ও তথ্যগত ঘাটতি কার্যকর সাড়া দেয়ার পথে বড় বাধা। বাংলাদেশ আবহাওয়া পূর্বাভাস ও কৃষি আবহাওয়া পরামর্শ সেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু পূর্বাভাস তখনই কার্যকর, যখন তা যথাসময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে এবং কৃষক সেটি বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারেন। একজন কৃষকের জটিল আবহাওয়া বিষয়ক তথ্যের প্রয়োজন নেই। তার প্রয়োজন স্পষ্ট নির্দেশনা, কখন সেচ দেবেন, কখন সার প্রয়োগ করবেন, কখন মাঠের কাজ পিছিয়ে দেবেন অথবা কখন আগাম ধান কাটবেন। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুধু পূর্বাভাস তৈরি করা নয়; বরং সেটিকে সময়োপযোগী, স্থানভিত্তিক ও কৃষকবান্ধব সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত, সময়োপযোগী ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন ব্যবস্থা পদ্ধতি। প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়। হাওর কৃষির সঙ্গে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আইসিটি বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনসহ বহু সংস্থা জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত তথ্য বিনিময় ও দ্রুত সাড়া দেয়ার ব্যবস্থার আওতায় কাজ করতে হবে। এ ধরনের সমন্বয় আবহাওয়া ও বন্যার পূর্বাভাসের পর্যাপ্ত লিড টাইম নিশ্চিত করতে পারে, সময়মতো কার্যকর কৃষি পরামর্শ তৈরি করতে পারে, আইসিটি-ভিত্তিক মাঠপর্যায়ের দ্রুত সাড়া জোরদার করতে পারে এবং কৃষক, ফসল ও জাতীয় ধান উৎপাদনকে আরো ভালোভাবে সুরক্ষা দিতে পারে। হাওরের জন্য বাংলাদেশের একটি সমন্বিত জাতীয় সহনশীলতা পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে দায়িত্ব, সময়সীমা, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। দ্বিতীয়ত, বাঁধ ব্যবস্থাপনায় জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ সময় শুরুর আগেই পরিকল্পনা, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারি শেষ করতে হবে। স্থানীয় কৃষকদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে, যাতে তারা বাঁধের দুর্বল অংশ, বিলম্ব বা ভাঙনের ঝুঁকি আগেই জানাতে পারেন। তৃতীয়ত, বন্যা-পরবর্তী দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণকে নিয়মিত ব্যবস্থার অংশ করতে হবে। রিমোট সেন্সিংভিত্তিক বন্যা প্লাবন মানচিত্র ব্যবহার করে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা শনাক্ত, ফসলের ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ ও সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষতি হিসাব করা সম্ভব। এ ধরনের প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে দ্রুত শনাক্ত করতে, স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে, লক্ষ্যভিত্তিক পুনর্বাসন সহায়তা দিতে এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সাড়ায় বিলম্ব কমাতে সহায়ক হবে। চতুর্থত, কৃষকদের ফসলহানির বিরুদ্ধে আর্থিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। ফসল বীমা, জরুরি ক্ষতিপূরণ, বিনাসুদে ঋণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক পুনরুদ্ধার সহায়তা কৃষকদের বড় ক্ষতির পর ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারে। সময়মতো আর্থিক সুরক্ষা না থাকলে একটি বন্যাই ক্ষুদ্র কৃষককে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ফাঁদে ঠেলে দিতে পারে। পঞ্চমত, হাওর কৃষিতে ধীরে ধীরে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। বোরো ধান কেন্দ্রীয় ফসল হিসেবেই থাকবে, তবে স¤পূর্ণভাবে এক ফসলের ওপর নির্ভরশীলতা কৃষকদের ঝুঁকির মুখে ফেলে। স্বল্পমেয়াদি ফসল, মৎস্যচাষ, প্রাণিসম্পদ এবং সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা অতিরিক্ত আয় সৃষ্টি করতে পারে এবং ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে এ বৈচিত্র্য হাওরের স্বতন্ত্র পরিবেশ ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এটি ধান উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করবে না; বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। হাওর উপযোগী ধানের জাত হতে হবে স্বল্পমেয়াদি, উচ্চফলনশীল, জলমগ্নতা-সহনশীল এবং তাপ-সহনশীল। পরিবর্তিত বৃষ্টিপাতের ধরন ও বাড়তি তাপমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি ব্যবস্থাপনাও অভিযোজিত করতে হবে। সবশেষে, বড় ধরনের বোরো উৎপাদন ক্ষতি হলে আউশ ও আমন উৎপাদনের জন্য আগাম পরিকল্পনা নিতে হবে। এ পরিকল্পনার মধ্যে থাকতে হবে সময়মতো বীজ সরবরাহ, উপকরণ সহায়তা, সেচ পরিকল্পনা, সম্প্রসারণ সেবা এবং অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা। এমন দূরদর্শী উদ্যোগ হারানো ধান উৎপাদনের একটি অংশ পুনরুদ্ধার, জাতীয় চালের ভারসাম্য রক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। হাওরের ধানের গল্প শেষ পর্যন্ত এক ধরনের সহনশীলতার গল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষকরা অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন। কিন্তু সহনশীলতা মানে বারবার ক্ষতি মেনে নেয়া নয়। সহনশীলতা মানে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা আগাম বিপদ বুঝতে পারে, ক্ষতি কমাতে পারে এবং জীবিকা রক্ষা করতে পারে। জলবায়ু অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, হাওরের ধান রক্ষা ততই জাতীয় অগ্রাধিকার হয়ে উঠছে। বার্তা স্পষ্ট: দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট নয়, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ কার্যকর নয়, আর বিলম্বের মূল্য অনেক বেশি। হাওরের মাঠ আবারো সোনালি হবে। কিন্তু সেই সোনালি ফসল ঘরে উঠবে, নাকি পানির নিচে হারিয়ে যাবে তা নির্ভর করবে পানি আসার আগেই আমরা কতটা কার্যকরভাবে প্রস্তুতি নিতে পারি তার ওপর। আগামী বন্যার আগেই হাওরের ধান রক্ষা করা শুধু কৃষির প্রয়োজন নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতার জাতীয় অপরিহার্যতা।
[ড. নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন গবেষক), কৃষি পরিসংখ্যান বিভাগ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
বন্যার আগেই হাওরের ধান রক্ষা করতে হবে
- আপলোড সময় : ০৮-০৭-২০২৬ ১১:৩৪:৫৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৮-০৭-২০২৬ ১১:৩৫:৩৮ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক